প্রতিদিন ১০,০০০ পদক্ষেপ হাঁটার লক্ষ্য অনেকের কাছেই পরিচিত। তবে এটি যে একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সীমা নয়, তা আগেই জানা ছিল। নতুন একটি বড় গবেষণা এবার দেখাচ্ছে—শুধু কতটা হাঁটছেন তা নয়, কত দ্রুত হাঁটছেন সেটিও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার পটভূমি ও পদ্ধতি
গবেষণায় ১,০৩,৬৮৪ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, যাদের বয়স ছিল ৪০ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে। তারা নির্দিষ্ট সময়ে টানা ৭ দিন একটি অ্যাক্টিভিটি ট্র্যাকার ব্যবহার করেন, যা তাদের দৈনিক পদক্ষেপ এবং হাঁটার গতি পরিমাপ করে।
গবেষকরা “পিক ৩০-মিনিট ক্যাডেন্স” নামে একটি সূচক ব্যবহার করেন, যা দিনে সবচেয়ে দ্রুত ৩০ মিনিটের হাঁটার গড় পদক্ষেপ (প্রতি মিনিটে) নির্দেশ করে। এরপর অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮ বছর ধরে অনুসরণ করে তাদের মধ্যে মোট মৃত্যুহার ও হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর হার বিশ্লেষণ করা হয়।
কী পাওয়া গেল গবেষণায়?
- প্রতিদিন ৭,৫০০ থেকে ১০,০০০ পদক্ষেপ হাঁটা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম
- যারা ৫,০০০-এর কম পদক্ষেপ নেন কিন্তু দ্রুত হাঁটেন (প্রতি মিনিটে ৮০+ পদক্ষেপ), তাদের ঝুঁকি কমে আসে
- এমনকি তারা অনেক ক্ষেত্রে ধীর গতিতে ১০,০০০ পদক্ষেপ হাঁটা ব্যক্তিদের সমতুল্য ঝুঁকিতে থাকতে পারেন
- ধীর গতিতে মাঝারি হাঁটার চেয়ে দ্রুত গতিতে কম হাঁটা বেশি উপকারী হতে পারে
গবেষকের মন্তব্য
“এই গবেষণার মূল বার্তা হলো—ব্যবহারিক নমনীয়তা। সবার জন্য এক ধরনের লক্ষ্য প্রযোজ্য নয়। কেউ যদি বেশি হাঁটতে না পারেন বা দ্রুত হাঁটতে না পারেন, তবুও ঝুঁকি কমানোর বিকল্প পথ রয়েছে। তবে এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা, তাই সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখা উচিত নয়।”
“পদক্ষেপের সংখ্যা এবং হাঁটার তীব্রতা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। যে সমন্বয়টি একজন ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে পারেন, সেটিই সবচেয়ে কার্যকর। ৭,৫০০ থেকে ১০,০০০ পদক্ষেপ সর্বনিম্ন ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত ছিল, তবে যারা এর চেয়ে কম হাঁটেন, তারা যদি দ্রুত হাঁটেন, তাহলেও একই ধরনের উপকার পেতে পারেন।”
কেন দ্রুত হাঁটা উপকারী?
গবেষকরা এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন:
“অধিক নড়াচড়া বা বেশি তীব্রতার নড়াচড়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সহায়তা করে, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং সামগ্রিক কার্ডিওমেটাবলিক ঝুঁকি কমায়।”
কম হাঁটলেও কীভাবে উপকার পাবেন?
গবেষণাটি বিশেষ করে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা সময় বা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বেশি হাঁটতে পারেন না। মূল বার্তা হলো:
👉 যতটুকু হাঁটবেন, সেটুকুই একটু দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করুন।
দৈনন্দিন জীবনে সহজে যুক্ত করার উপায়
- সকালে বা বিকেলে ১০–১৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা
- অফিস বা পড়াশোনার ফাঁকে ছোট হাঁটার বিরতি
- লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার
- রাতের খাবারের পর হালকা কিন্তু দ্রুত হাঁটা
ছোট ছোট অভ্যাস, বড় প্রভাব
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে:
“সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন আসে যখন কেউ একেবারে নিষ্ক্রিয় অবস্থা থেকে কিছুটা সক্রিয় হয়। প্রতিদিন অল্প সময়ের নড়াচড়াও দীর্ঘমেয়াদে বড় উপকার এনে দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো শুরু করা এবং নিয়মিত থাকা।”
“প্রতিদিন এক ঘণ্টা জিমে যাওয়া জরুরি নয়। দিনের মধ্যে ছোট ছোট সময়ে নড়াচড়া—যেমন হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সিঁড়ি ব্যবহার—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিকতাই এখানে মূল বিষয়।”
নিয়মিততাই আসল চাবিকাঠি
“শরীর মাঝে মাঝে অতিরিক্ত পরিশ্রমের চেয়ে নিয়মিত অভ্যাসে বেশি সাড়া দেয়। তাই প্রতিদিনের ধারাবাহিকতা দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সংক্ষেপে
- বেশি হাঁটা ভালো, কিন্তু দ্রুত হাঁটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ
- কম হাঁটলেও গতি বাড়ালে উপকার পাওয়া যায়
- নিয়মিত অল্প অল্প করে হাঁটাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর
তাই লক্ষ্য একটাই—নিয়মিত হাঁটা, আর সুযোগ পেলে একটু দ্রুত হাঁটা।