যদি কখনো পার্কে হাঁটতে গিয়ে বা গাছপালার মাঝে কিছু সময় কাটিয়ে নিজেকে শান্ত মনে হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কল্পনা নয়—এর পেছনে আছে বিজ্ঞান।
প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো আমাদের শরীরে বাস্তব পরিবর্তন আনে। এটি স্ট্রেস হরমোন কমাতে সাহায্য করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, এমনকি অন্ত্রের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটায়।
এই উপকার পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার দরকার নেই। মাত্র ২০ মিনিট সময় কাটালেই এর সর্বোচ্চ প্রভাব পাওয়া যায়। তাই সপ্তাহে কয়েকবার দুপুরে পার্কে একটু হাঁটা বা বেঞ্চে বসে খাওয়া—এগুলোই আপনার শরীর ও মনের জন্য উপকারী হতে পারে।
নিচে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর চারটি উপকারিতা তুলে ধরা হলো—
১. আপনি অজান্তেই শান্ত হয়ে যান
সবুজ গাছপালা দেখা, পাইন গাছের গন্ধ নেওয়া, পাতার মৃদু শব্দ বা পাখির ডাক শোনা—এসব আমাদের স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রকে (autonomic nervous system) সক্রিয় করে, যা শরীরের অবচেতন প্রক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
এমনকি কাছের কোনো পার্কে গেলেও এই প্রভাব দেখা যায়। এতে রক্তচাপ কমে, হৃদস্পন্দনের হার নিয়ন্ত্রিত হয় এবং শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হয়।
যুক্তরাজ্যের প্রায় ২০,০০০ মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত ১২০ মিনিট প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা জানান।
এমনকি “গ্রিন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং” নামে একটি পদ্ধতিও চালু হয়েছে, যেখানে মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে তাদের স্বাস্থ্য ও সুখ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
২. আপনার হরমোনের ভারসাম্য ঠিক হয়
প্রকৃতির সংস্পর্শে এলে শরীরের হরমোন ব্যবস্থাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন—যে হরমোনগুলো স্ট্রেস ও উদ্বেগ বাড়ায়—তাদের মাত্রা কমে যায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তিন দিন একটি হোটেল কক্ষে থেকে হিনোকি (জাপানি সাইপ্রেস) তেলের গন্ধ নিয়েছিলেন, তাদের শরীরে অ্যাড্রেনালিন কমে যায় এবং “ন্যাচারাল কিলার সেল” নামক রোগ প্রতিরোধী কোষের সংখ্যা বেড়ে যায়।
এই কোষগুলো ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। আশ্চর্যের বিষয়, গন্ধ নেওয়ার দুই সপ্তাহ পরও এই কোষের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।
অর্থাৎ, প্রকৃতি শরীরকে যেটা দরকার সেটাই করে—যেখানে শান্ত হওয়া প্রয়োজন সেখানে শান্ত করে, আর যেখানে শক্তি দরকার সেখানে শক্তি জোগায়।
৩. গন্ধের প্রভাব অনেক শক্তিশালী
প্রকৃতির গন্ধ—মাটি, গাছ, ফুল—এসবের মধ্যে থাকা বিভিন্ন জৈব যৌগ আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এবং সরাসরি প্রভাব ফেলে।
উদাহরণ হিসেবে, পাইন বনের গন্ধ মাত্র ৯০ সেকেন্ডেই মনকে শান্ত করতে পারে এবং এর প্রভাব প্রায় ১০ মিনিট স্থায়ী হয়।
এমনকি খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, যাদের কোনো স্মৃতি নেই, তবুও কিছু নির্দিষ্ট গন্ধ (যেমন লিমোনিন) তাদের শান্ত করে দেয়। অর্থাৎ, প্রকৃতির প্রভাব শুধুই মানসিক নয়, শারীরিকও।
৪. এটি আপনার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়
প্রকৃতির মাটি ও গাছপালায় অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা আমাদের শরীরের জন্য ভালো।
এগুলো সেই একই ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যেগুলো আমরা প্রোবায়োটিক খাবার বা পানীয় থেকে পাওয়ার চেষ্টা করি।
প্রকৃতির এই ব্যাকটেরিয়া শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। গাছপালা থেকে নির্গত “ফাইটোনসাইড” নামের রাসায়নিক পদার্থও রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকৃতিকে ঘরে নিয়ে আসুন
সবসময় বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলেও চিন্তার কিছু নেই। ছোট ছোট উপায়ে ঘরেই প্রকৃতির ছোঁয়া আনা যায়।
যেমন—
- ঘরে ফুল রাখা (বিশেষ করে সাদা বা হলুদ গোলাপ)
- সুগন্ধি তেল ব্যবহার করা
- কিংবা প্রকৃতির ছবি দেখা
গবেষণায় দেখা গেছে, এমনকি প্রকৃতির ছবি দেখলেও মস্তিষ্কে শান্তির অনুভূতি তৈরি হয় এবং স্ট্রেস কমে।
সবশেষে বলা যায়—প্রকৃতির সঙ্গে যতটুকুই সংযোগ রাখা যায়, সেটুকুই আমাদের শরীর ও মনের জন্য উপকারী।
-সৌজন্যে: ইয়াসমিন রুফো (বিবিসি)